ঢাকার ৭ কলেজ: অধিভুক্তি থেকে নতুন বিশ্ববিদ্যালয়, পরিবর্তন না সঙ্কট?
বিগত আট বছর ধরে ঢাকার স্বনামধন্য সাতটি কলেজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত ছিল। ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনায় এই কলেজগুলোকে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ঢাবির অধীনে আনা হয়। অধিভুক্তির মূল উদ্দেশ্য ছিল শিক্ষার মান উন্নয়ন, কিন্তু বাস্তবতা ছিল ভিন্ন। এই সময়কালে অবকাঠামো, সিলেবাস বা শিক্ষকের সংখ্যায় বড় কোনো পরিবর্তন আসেনি। বরং নানা ধরনের জটিলতা শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবনকে আরও কঠিন করে তুলেছিল।
![]() |
| রাজধানীর সরকারি ৭ কলেজ |
⏹️ পূর্ববর্তী সমস্যাগুলো ছিল বহুমুখী
*️⃣ শিক্ষক ও আসনের সংকট: প্রতিটি বিভাগে ৩০০ থেকে ৪৫০ জন শিক্ষার্থী ভর্তি করানো হতো, যার ফলে ক্লাসে দাঁড়ানোর জায়গা পাওয়াও কঠিন ছিল। পর্যাপ্ত শিক্ষকের অভাব ছিল প্রকট। অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিভাগ, যেমন তিতুমীর কলেজের পরিসংখ্যান ও মনোবিজ্ঞান বিভাগ, মাত্র ২-৩ জন শিক্ষক দিয়ে চলত।
*️⃣ সিলেবাস ও পাঠদান: জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরোনো সিলেবাস প্রায় হুবহু অনুসরণ করা হতো, যেখানে কোনো আধুনিক সংযোজন ছিল না। অনেক সময় নির্দিষ্ট সিলেবাসের বাইরে থেকে প্রশ্ন করা হতো, যা শিক্ষার্থীদের জন্য বড় সংকট তৈরি করত।
*️⃣ পরীক্ষা ও মূল্যায়ন: প্রশ্ন প্রণয়ন, খাতা মূল্যায়ন এবং ফলাফল প্রকাশে ব্যাপক জটিলতা ছিল। কারা প্রশ্ন তৈরি করবে বা খাতা দেখবে, তা নিয়েও স্বচ্ছতার অভাব ছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক বা সাত কলেজের যেকোনো শিক্ষকের হাতে খাতা মূল্যায়ন হতো, যার ফলে সঠিক মূল্যায়নের বিষয়টি প্রায়ই উপেক্ষিত হতো।
*️⃣ ফলাফল প্রকাশে দীর্ঘসূত্রতা: প্রতি বছর ফলাফল পেতে ৪ থেকে ৭ মাস পর্যন্ত সময় লাগত, যার ফলে এক বর্ষের পরীক্ষার ফল প্রকাশ হতে হতেই পরবর্তী বর্ষের পরীক্ষা চলে আসত। পরীক্ষা ও ফলাফল সংক্রান্ত এই দীর্ঘসূত্রতা শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত করে তুলছিল।
⏹️ নতুন প্রস্তাবিত 'ঢাকা কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়' এবং বর্তমান পরিস্থিতি
সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্তি বাতিল করে 'ঢাকা কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়' নামে একটি প্রস্তাবিত নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে এই কলেজগুলোর কার্যক্রম পরিচালনার নোটিশ জারি হয়েছে। এতে আসন সংখ্যা কমিয়ে প্রায় ১১,১৫০ করা হলেও, পাঠদানের মানোন্নয়নের কোনো সুনির্দিষ্ট রূপরেখা এখনো নেই।
এই পরিবর্তনের মূল দিকগুলো হলো:
*️⃣ আসন সংখ্যা কমানো হয়েছে, কিন্তু শিক্ষক সংকট বা পাঠদান পদ্ধতির সংস্কারের কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি।
*️⃣ একটি অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসনের অধীনে (ঢাকা কলেজের অধ্যক্ষকে প্রধান করে) ভর্তি কার্যক্রম শুরু হচ্ছে।
*️⃣ ২০২৫ সালের জুলাইয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের পর ভর্তি প্রক্রিয়া শুরু করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
*️⃣ সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা হলো, শিক্ষার্থীরা কোন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সার্টিফিকেট পাবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
⏹️ নতুন কাঠামোতে সম্ভাব্য সংকটসমূহ
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত হয়ে যে সমস্যাগুলোর সৃষ্টি হয়েছিল, তার সমাধান না করে শুধু প্রশাসনিক কাঠামো পরিবর্তন এবং আসন সংখ্যা কমিয়ে দেওয়ার এই সিদ্ধান্ত কতটা ফলপ্রসূ হবে, তা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন থেকেই যায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো একটি শক্তিশালী প্রশাসনের পরিবর্তে ঢাকা কলেজের প্রশাসনের অধীনে এত বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থীর শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করা কতটা সম্ভব, তা নিয়ে আশঙ্কা রয়েছে।
এই পরিবর্তনকে অনেকটা 'BD National 2.0' হিসেবে দেখা যাচ্ছে। এটি একটি শক্তিশালী কাঠামো থেকে সরে এসে আরও দুর্বল কাঠামোতে ফিরে যাওয়া। আসন সংখ্যা কমলেও এবং শিক্ষার্থী অনুপাতে শিক্ষকের সংখ্যা বাড়লেও, উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়ন কতটা নিশ্চিত হবে তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। কারণ, শিক্ষক কাঠামোতে এখনও উচ্চতর গবেষণাধর্মী শিক্ষকের চরম সংকট বিদ্যমান, শতভাগ শিক্ষকই বিসিএস শিক্ষা ক্যাডার থেকে আসা তাছাড়াও সিলেবাস সংক্রান্ত কোন স্পষ্ট পরিবর্তন নেই।








2 comments:
Good 👍
Good analysis
Post a Comment