ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি: আদর্শিক প্রতিষ্ঠা থেকে বর্তমান আর্থিক সংকট
এই প্রতিবেদনটি ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি (IBBL)-এর চার দশকের যাত্রা, এর আদর্শিক প্রতিষ্ঠা, জাতীয় অর্থনীতিতে এর অনবদ্য অবদান, রাজনৈতিক প্রভাবের মাধ্যমে মালিকানা দখল এবং পরবর্তীকালে সৃষ্ট ভয়াবহ আর্থিক বিপর্যয় ও বর্তমান পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার একটি বিশদ বিশ্লেষণ।
অধ্যায় ১: সূচনালগ্ন ও শরিয়াহভিত্তিক মডেলের ভিত্তি (১৯৮৩-২০০০)
১.১. ইসলামী ব্যাংকিংয়ের বৈশ্বিক পটভূমি ও বাংলাদেশে এর প্রয়োজনীয়তা
ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড (IBBL) প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বিশ্বজুড়ে ইসলামী ব্যাংকিংয়ের উত্থানের পটভূমিতে, যখন ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের মধ্যে শরিয়াহ-সম্মত আর্থিক ব্যবস্থার চাহিদা বাড়ছিল । শরিয়াহ অর্থায়ন, যা সুদ বা রিবাকে নিষিদ্ধ করে, মুদারাবা (লাভ-লোকসান ভাগাভাগি), মুরাবাহা (খরচ-যোগ-লাভ), এবং ইজারা (ভাড়া বা লিজ) এর মতো চুক্তিনির্ভর মডেলের মাধ্যমে পরিচালিত হয় ।
বাংলাদেশে এই ধারার সূচনা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না। ১৯৭৪ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দ্বিতীয় ওআইসি সম্মেলনে যোগদানের সূত্র ধরে বাংলাদেশ ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (IDB)-এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হয় । এই আন্তর্জাতিক সংযোগই বাংলাদেশে শরিয়াহ-ভিত্তিক ব্যাংকিংয়ের ভিত্তি স্থাপন করে। এর ধারাবাহিকতায়, কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্তৃক ১৯৮১ সালের ২৩ এপ্রিল ‘অনাপত্তি’ পত্র পাওয়ার পর, অবশেষে ১৯৮৩ সালের ২৭ মার্চ ব্যাংকটি ‘ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড’ নামে ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনার জন্য লাইসেন্স পায়। জয়েন্ট স্টক কোম্পানি হিসেবে ১৩ মার্চ ১৯৮৩ সালে এটি পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি হিসেবে অনুমোদন লাভ করে এবং ৩০ মার্চ ১৯৮৩ তারিখে কার্যক্রম শুরু করে । এর মাধ্যমে এটি দক্ষিণ ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার প্রথম পূর্ণাঙ্গ ইসলামী ব্যাংক হিসেবে যাত্রা শুরু করে।
১.২. জামায়াত-ই-ইসলামী, আদর্শিক চালিকাশক্তি ও দেশীয় উদ্যোক্তাদের ভূমিকা
IBBL এর প্রতিষ্ঠা শুধুমাত্র একটি বাণিজ্যিক উদ্যোগ ছিল না; এটি ছিল জামায়াত-ই-ইসলামীর আর্থসামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি ও নেতৃত্বের দ্বারা চালিত একটি আদর্শিক স্বপ্ন । জামায়াতের প্রভাবশালী ব্যবসায়ী ও চিন্তাবিদদের সক্রিয় প্রচেষ্টায় বাংলাদেশে সুদমুক্ত ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রবর্তন সম্ভব হয়েছিল।
প্রথম দিককার স্থানীয় উদ্যোক্তাদের মধ্যে আব্দুর রাজ্জাক লস্কর, মোশাররফ হোসেন, জাকি উদ্দীন আহমেদ, মাওলানা আব্দুর জব্বার মোহাম্মদ ইউনুস, এবং ইঞ্জিনিয়ার মোস্তফা আনোয়ারসহ অনেকে ছিলেন । উদ্যোক্তারা এই বিনিয়োগকে স্রেফ ব্যবসা হিসেবে না দেখে, বরং সুদের গুনাহ থেকে মানুষকে মুক্ত করার একটি মহৎ উদ্দেশ্য হিসেবে বিবেচনা করেন। একজন উদ্যোক্তা সে সময়ের পরিস্থিতিতে ব্যাংক সফল না হলেও এই বিনিয়োগকে ‘ছদকায়ে জারিয়া’ (চলমান সওয়াব) হিসেবে আল্লাহর পথে দান করার মানসিকতা পোষণ করেন, যা IBBL প্রতিষ্ঠার পেছনে তীব্র ধর্মীয় ও সামাজিক দায়বদ্ধতার অনুপ্রেরণা প্রমাণ করে ।
এই ব্যাংককে আর্থিক ভিত্তি দিতে শুধু ব্যক্তিরাই নয়, জামায়াত প্রভাবিত একাধিক সামাজিক ও কল্যাণমুখী প্রতিষ্ঠান যেমন ইবনে সিনা ট্রাস্ট এবং আল-আরাজ ট্রাস্ট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই দেশীয় প্রতিষ্ঠানের সম্পৃক্ততা ব্যাংকটিকে ধর্মপ্রাণ মানুষ এবং সাধারণ ব্যবসায়ীদের কাছে আস্থাভাজন করে তোলে।
১.৩. আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ ও কূটনৈতিক সমর্থন: সাফল্যের প্রথম ধাপ
IBBL-এর দ্রুত প্রতিষ্ঠা ও সমৃদ্ধির একটি মূল কারণ ছিল এর শক্তিশালী আন্তর্জাতিক ভিত্তি। প্রতিষ্ঠাকালে ব্যাংকটির মূলধনের প্রায় অর্ধেকই এসেছিল বৈদেশিক বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে।
আন্তর্জাতিক শেয়ারহোল্ডারদের মধ্যে সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার, বাহরাইন, এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের স্বনামধন্য ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলি অন্তর্ভুক্ত ছিল। গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক অংশীদারদের মধ্যে ছিল ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (IDB), দুবাই ইসলামিক ব্যাংক, কুয়েত ফাইনান্স হাউস, এবং সৌদী আল-রাযী কোম্পানি । এই আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ কেবল মূলধনই জোগান দেয়নি, বরং বাংলাদেশে বৈশ্বিক ইসলামী ব্যাংকিং খাতের অভিজ্ঞতা ও প্রযুক্তি নিয়ে আসার পথও প্রশস্ত করেছিল।
এই আন্তর্জাতিক সংযোগ স্থাপনে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে, ঢাকায় নিযুক্ত তৎকালীন সৌদী রাষ্ট্রদূত ফুয়াদ আব্দুল হামিদ আল-খতিব বিভিন্ন বিদেশী প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির সাথে যোগাযোগ স্থাপন ও সহযোগিতা নিশ্চিত করতে মুখ্য ভূমিকা পালন করেন । ফলে IBBL শুরু থেকেই একটি শক্তিশালী বৈশ্বিক নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত হতে পেরেছিল।
১.৪. প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক ও প্রথম ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের দূরদর্শিতা
নতুন ধারার এই ব্যাংক পরিচালনার জন্য শুরুতে ব্যবস্থাপনা পরিচালক (MD) নিয়োগে জটিলতা দেখা দেয়, কারণ মহাব্যবস্থাপক বা তদূর্ধ্ব পদমর্যাদার অভিজ্ঞ কর্মকর্তা পাওয়া যাচ্ছিল না । এই পরিস্থিতিতে, সোনালী ব্যাংক স্টাফ কলেজের অধ্যক্ষ এম আযীযুল হককে ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী হিসেবে নিয়োগের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিশেষ অনুমোদন দেয়। তিনি ১৯৮৩ সালের ১ মার্চ দেশের প্রথম ইসলামী ব্যাংকের প্রথম প্রধান নির্বাহী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন ।
প্রতিষ্ঠার পর থেকেই IBBL শরিয়াহ পরিপালনের ওপর জোর দেয়। ইসলামী ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুসারে, প্রতিটি ইসলামী ব্যাংককে শরিয়াহ নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ এবং নিরীক্ষার জন্য পরিচালনা পর্ষদ দায়বদ্ধ থাকে । IBBL এই নীতিগুলি বাস্তবায়নের মাধ্যমে ধর্মীয় ও অর্থনৈতিক উভয় ক্ষেত্রেই সাধারণ জনগণের আস্থা অর্জন করে।
অধ্যায় ২: স্বর্ণযুগ ও জাতীয় অর্থনীতিতে অনবদ্য অবদান (২০০০-২০১৬)
২.১. অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে IBBL-এর ভূমিকা
প্রতিষ্ঠার পর দীর্ঘকাল IBBL দেশের অন্যতম সফল বেসরকারি ব্যাংক হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করে। গত দুই দশক ধরে আমানত, বিনিয়োগ, আমদানি-রপ্তানি এবং বিশেষ করে প্রবাসী রেমিট্যান্স আহরণসহ প্রায় সব ক্ষেত্রেই এটি দেশের ব্যাংকিং খাতে শীর্ষস্থান ধরে রাখে ।
রেমিট্যান্স প্রবাহে নেতৃত্ব: ইসলামী ব্যাংক দ্রুতই প্রবাসী রেমিট্যান্স আনার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সবচেয়ে সফল ব্যাংকে পরিণত হয় [User Query]। ২০২২ সালের তথ্য অনুযায়ী, ইসলামী ব্যাংক প্রায় ৪৫,৬৯৭ কোটি টাকা রেমিট্যান্স আহরণ করেছিল, যা দেশের মোট রেমিট্যান্সের এক-তৃতীয়াংশের বেশি । এই সাফল্য শুধু বাণিজ্যিক ছিল না; মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত প্রবাসীরা, যারা প্রায়শই অবৈধ চ্যানেলে টাকা পাঠাতেন, তারা ইসলামী ব্যাংকের শরিয়াহ-সম্মত ভাবমূর্তি এবং নিরাপত্তা দেখে বৈধ চ্যানেলে টাকা পাঠাতে উৎসাহিত হন। এই প্রক্রিয়াটি জাতীয় অর্থনীতিতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে ।
শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থান: ব্যাংকটির বিনিয়োগ জাতীয় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়নে এক অনবদ্য অংশীদার হিসেবে কাজ করেছে। এর বিনিয়োগে ৩৮ বছরে দেশে প্রায় ৮৪ লাখ মানুষের প্রত্যক্ষ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয় । দেশের অনেক বড় শিল্পগোষ্ঠীর বিকাশে IBBL-এর অবদান ছিল। রফতানিমুখী তৈরি পোশাক খাতের ৩৬ শতাংশ এবং টেক্সটাইল খাতের ৬০ শতাংশ প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে এই ব্যাংকটির বিনিয়োগের মাধ্যমে। এছাড়াও, তৈরি পোশাক খাতের ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি উদ্ভাবন ও বাস্তবায়নেও ব্যাংকটির মুখ্য ভূমিকা ছিল । আবাসন, পরিবহন (১৮ শতাংশ মার্কেট শেয়ার) এবং দুই হাজারের বেশি কৃষিভিত্তিক শিল্প-কারখানা IBBL-এর অর্থায়নে পরিচালিত হয়েছে ।
২.২. সামাজিক দায়বদ্ধতা ও আর্থিক অন্তর্ভুক্তি
ইসলামী ব্যাংক শুধু মুনাফাকেন্দ্রিক ছিল না; এটি সামাজিক কল্যাণ ও আর্থিক অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। গরিব, দুস্থ, অসহায় মানুষের কল্যাণে ১৯৮৪ সালে ‘সাদাকাহ ফান্ড’ গঠিত হয়, যা পরে ‘ইসলামী ব্যাংক ফাউন্ডেশন’ হিসেবে ব্যাপকভিত্তিক কার্যক্রম শুরু করে ।
এই ফাউন্ডেশন স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণে উদ্যোগী হয়, যার মধ্যে রয়েছে ১০টি নিজস্ব হাসপাতাল, নয়টি কমিউনিটি হাসপাতাল এবং একটি পূর্ণাঙ্গ মেডিকেল কলেজ পরিচালনা । এছাড়া, IBBL তার মাইক্রোফিন্যান্স কার্যক্রমের মাধ্যমে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর আর্থিক অন্তর্ভুক্তিতে কাজ করে, যা বিপুল সংখ্যক ক্ষুদ্র গ্রাহককে সঞ্চয়ী মনোভাব গড়ে তুলতে সহায়তা করে এবং গ্রামীণ দারিদ্র্য বিমোচনে অবদান রাখে ।
২.৩. প্রাক-২০১৭ স্থিতিশীলতা ও জঙ্গি অর্থায়নের অভিযোগ
২০১৭ সালের পূর্বে, ইসলামী ব্যাংক তার উচ্চ আন্তর্জাতিক শেয়ারহোল্ডিংয়ের কারণে (প্রায় ৬৩ শতাংশ) একটি স্থিতিশীল ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বজায় রেখে চলছিল । তবে, এই সময়ে সরকারের পক্ষ থেকে ব্যাংকটির বিরুদ্ধে একটি গুরুতর রাজনৈতিক অভিযোগ আনা হয়—তা হলো, এর লাভের টাকা দেশবিরোধী কর্মকাণ্ডে বা জঙ্গিদের অর্থায়নে ব্যবহৃত হচ্ছিল ।
এই অভিযোগটি ছিল অত্যন্ত সংবেদনশীল। যদিও আন্তর্জাতিকভাবে অর্থ পাচার বা জঙ্গি অর্থায়ন ট্র্যাক করার জন্য এফবিআই এবং ইউএস ট্রেজারি ডিপার্টমেন্ট কাজ করে , এবং এফএটিএফ (FATF) বাংলাদেশে এ বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে , কিন্তু IBBL-এর বিরুদ্ধে এই ধরনের কোনো অভিযোগ কখনোই আন্তর্জাতিকভাবে নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত বা দালিলিকভাবে সুনির্দিষ্ট করা হয়নি। সরকার এই অভিযোগটিকে এমন একটি পটভূমি হিসেবে ব্যবহার করে, যা ২০১৭ সালের মালিকানা পরিবর্তনের একটি প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সরকারের ভাষ্য ছিল, দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে জামায়াত-শিবিরের রাজনৈতিক আদর্শ বিস্তারের কৌশলটি ব্যাংকটির মাধ্যমে পরিচালিত হতো, যা রোধ করা জরুরি ছিল ।
অধ্যায় ৩: মালিকানা পরিবর্তন ও কর্পোরেট দখল (২০১৭)
৩.১. রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও 'শুদ্ধি অভিযান'
২০১৭ সালের জানুয়ারিতে শেখ হাসিনা সরকারের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে একটি বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। সরকারের লক্ষ্য ছিল ব্যাংকটিকে ‘জামায়াতমুক্ত’ করা এবং এর মাধ্যমে দেশবিরোধী নেতিবাচক কর্মকাণ্ডের পথ বন্ধ করা ।
২০১৭ সালের ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত পর্ষদ সভায় ব্যাংকটির চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান ও এমডিসহ গুরুত্বপূর্ণ পদে রদবদল আনা হয় । জামায়াতে ইসলামীর ঘনিষ্ঠ প্রতিষ্ঠান ইবনে সিনা ট্রাস্টের প্রতিনিধি মোস্তফা আনোয়ার চেয়ারম্যান পদ থেকে পদত্যাগ করেন। তার স্থলে সরকারের সাবেক সচিব আরাস্তু খান নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নেন। ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদেও পরিবর্তন এনে এস আলম গ্রুপের মালিকানাধীন ইউনিয়ন ব্যাংকের এমডি আবদুল হামিদ মিঞাকে নিয়োগের অনুমোদন দেওয়া হয় । যদিও এই পরিবর্তনকে ‘শান্তিপূর্ণ’ বলে অভিহিত করা হয় , তবে এই প্রক্রিয়াটি নির্দেশ করে যে ব্যাংকটিকে আদর্শিক নিয়ন্ত্রণের বাইরে আনার চেষ্টা করা হলেও, বাস্তবে এটি ভিন্ন রাজনৈতিক বলয়ের (সরকারের আস্থাভাজন) একটি কর্পোরেট গোষ্ঠীর হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছিল। এটি ছিল আদর্শিক শুদ্ধির বদলে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতাপ্রাপ্ত কর্পোরেট নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার ঘটনা ।
৩.২. এস আলম গ্রুপের কৌশলী শেয়ার অধিগ্রহণ
মালিকানা পরিবর্তনের পর শুরু হয় চট্টগ্রামভিত্তিক বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠী এস আলম গ্রুপের শেয়ার অধিগ্রহণের প্রক্রিয়া। এই অধিগ্রহণ ব্যাংকিং শিল্পের ইতিহাসে এক নজিরবিহীন 'কর্পোরেট দখল' হিসেবে বিবেচিত।
ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১ অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি, পরিবার বা গ্রুপ কোনো একক ব্যাংকের ১০ শতাংশের বেশি শেয়ার ধারণ করতে পারে না । কিন্তু এস আলম গ্রুপ এই আইন লঙ্ঘন করে ২৪টি শেল (বেনামি) কোম্পানির মাধ্যমে শেয়ার কেনা শুরু করে । তারা দ্রুতই ব্যাংকটির মোট শেয়ারের প্রায় ৮২ শতাংশ (৮১.৯২%) মালিকানা অর্জন করে, যা ব্যাংকিং খাতের নিয়ন্ত্রক দুর্বলতার চূড়ান্ত উদাহরণ । এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান সাইফুল আলম মাসুদ ব্যাংকটিকে তার ব্যক্তিগত সম্পদ তৈরির যন্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করেন, এবং এই প্রক্রিয়াকে মসৃণ করতে তিনি তার পরিবারের সদস্য ও অনুগতদের ব্যাংকের শীর্ষ পদগুলোতে বসানো শুরু করেন ।
৩.৩. আন্তর্জাতিক আস্থা ও বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাহার
এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণের সবচেয়ে ক্ষতিকর প্রভাব পড়ে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের আস্থার ওপর। দখলের আগে IBBL-এর ৫০ শতাংশের বেশি মালিকানা ছিল বিদেশিদের হাতে । কিন্তু এই অনিয়মিত পরিবর্তনের পর তা নেমে আসে মাত্র ১৩ শতাংশে ।
ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (IDB), যা IBBL-এর মূল পৃষ্ঠপোষকদের মধ্যে অন্যতম, এই হঠাৎ পরিবর্তনে উদ্বেগ প্রকাশ করে । IDB জানায়, গুরুত্বপূর্ণ বোর্ড সভার নোটিশ খুব কম সময়ের মধ্যে দেওয়া হতো, যার ফলে বিদেশি পরিচালকরা সভায় অংশ নিতে পারতেন না । এই প্রক্রিয়াটিকে যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি মর্মে উল্লেখ করে আইডিবি অর্থমন্ত্রীর কাছে চিঠি দেয় ।
ফলস্বরূপ, IDB তার শেয়ারের প্রায় ৫ শতাংশ বিক্রি করে দেয় (৭.৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২.৫ শতাংশ) । এছাড়াও, দুবাই ইসলামী ব্যাংক, কুয়েত ফাইনান্স হাউস, সৌদী আল-রাযী গ্রুপ, ইসলামিক ইনভেস্টমেন্ট অ্যান্ড করপোরেশন দোহা-সহ প্রায় সব মূল বিদেশী উদ্যোক্তা ও সাধারণ শেয়ারধারী প্রতিষ্ঠান ধীরে ধীরে শেয়ার ছেড়ে দেয় । এই গণ-প্রত্যাখ্যান সুস্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে আন্তর্জাতিক ইসলামী আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলি ব্যাংকের শরিয়াহ পরিপালন বা সুশাসন নিয়ে রাজনৈতিক প্রভাব এবং কর্পোরেট দুর্নীতির কারণে আস্থাহীনতায় ভুগতে শুরু করেছিল, যা IBBL-এর আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি ধ্বংস করে দেয়। দেশীয় প্রতিষ্ঠান ইবনে সিনা ট্রাস্টসহ বেশ কিছু জামায়াত-ঘনিষ্ঠ প্রতিষ্ঠানও শেয়ার তুলে নেয় ।
এই শেয়ার কাঠামোর নাটকীয় পরিবর্তন স্পষ্ট করে যে, জামায়াত-মুক্তির প্রক্রিয়া একটি কর্পোরেট দখলকে সহজ করে দেয়। এর ফলে আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সরে যাওয়া নিশ্চিত করে যে IBBL-এর ভাবমূর্তি আদর্শিক বা রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের কারণে নয়, বরং দুর্বল কর্পোরেট সুশাসনের কারণে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
অধ্যায় ৪: কাঠামোগত দুর্বলতা ও আর্থিক বিপর্যয়ের বিশ্লেষণ (২০১৭-২০২৪)
৪.১. ঋণ কেলেঙ্কারি ও বেনামে অর্থ লুটপাট
এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণকালে ইসলামী ব্যাংক ভয়াবহ ঋণ কেলেঙ্কারির শিকার হয়। বিভিন্ন রিপোর্ট অনুযায়ী, এস আলম গ্রুপ ও তার সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলো IBBL-এর ১৭টি শাখা থেকে নামে-বেনামে প্রায় ৫০,০০০ কোটি টাকা থেকে ৮০,০০০ কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণ তুলে নেয় । অন্যান্য তথ্যে সরাসরি $৫৬১.১৮ বিলিয়ন এবং পরোক্ষভাবে $৭৫.২৪ বিলিয়ন ঋণের কথা জানা যায় ।
এই বিশাল অঙ্কের ঋণ বিতরণ ব্যাংকের নিজস্ব নীতিমালার চরম লঙ্ঘন। IBBL-এর নীতিমালায় একক ব্যবসায়িক গ্রুপকে সর্বোচ্চ ৫ বিলিয়ন টাকা পর্যন্ত ঋণ দেওয়ার সীমা নির্ধারিত ছিল, যা এস আলম গ্রুপ মারাত্মকভাবে অতিক্রম করে । এই ঋণগুলি চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জ, ওআর নিজাম রোড, পাহাড়তলী এবং ঢাকার গুলশান শাখা থেকে বিতরণ করা হয়েছিল ।
এই বিশাল অঙ্কের ঋণ বিতরণের ধরন প্রমাণ করে যে এটি কেবল একটি খেলাপি ঋণ সমস্যা ছিল না, বরং অভ্যন্তরীণ জালিয়াতি এবং নিয়ন্ত্রক দুর্বলতাকে ব্যবহার করে পরিচালিত একটি সুপরিকল্পিত 'কর্পোরেট ক্যাপচার' (Corporate Capture) প্রক্রিয়া। এই ব্যাংকটিকে একক গোষ্ঠীর ব্যক্তিগত সম্পদ উপার্জনের যন্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল । এস আলম গ্রুপ তাদের অন্যান্য নিয়ন্ত্রিত ব্যাংক (যেমন ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক) থেকেও অনুরূপ প্রক্রিয়ায় শেল কোম্পানির (যেমন সাফড়ান ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল, হুদা এন্টারপ্রাইজ) মাধ্যমে অর্থ আত্মসাৎ করেছিল ।
৪.২. তারল্য সংকট ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হস্তক্ষেপ
লাগামহীন ও অনিয়ন্ত্রিত ঋণ বিতরণের ফলে ইসলামী ব্যাংক তীব্র তারল্য সংকটে পড়ে । অতিরিক্ত ঋণ বিতরণের ফলস্বরূপ, ব্যাংকটির আর্থিক কাঠামো ভেঙে পড়ে এবং আগস্ট ২০২৪ শেষে IBBL-এর চলতি হিসাবে ঘাটতি ছিল ২,২০১.৯৫ কোটি টাকা ।
ব্যাংকের আর্থিক অবস্থা এতটাই খারাপ হয়েছিল যে, ৩২ বছরের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ২০২৪ সালের জন্য IBBL কোনো লভ্যাংশ ঘোষণা করতে পারেনি। খেলাপি ঋণের বিপরীতে ব্যাংকটির প্রায় ৬৯,৭৭০ কোটি টাকার বিশাল প্রভিশন ঘাটতি ছিল, যা আর্থিক বিপর্যয়ের স্পষ্ট ইঙ্গিত ।
এই পরিস্থিতি মোকাবেলায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক (বাংলাদেশ ব্যাংক) হস্তক্ষেপ করতে বাধ্য হয়। ব্যাংকটির তারল্য সংকট কাটাতে তারা জরুরি তহবিল সরবরাহ করে । শেখ হাসিনা সরকারের পতনের আগে, বাংলাদেশ ব্যাংক এস আলমের নিয়ন্ত্রণাধীন ছয়টি ব্যাংককে প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা ছাপিয়ে ধার দিয়েছিল, যা পরবর্তীতে এই গ্রুপের কাছেই লুটপাট হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে । কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গ্যারান্টির মাধ্যমে আন্তঃব্যাংক বাজার থেকে তহবিল সংগ্রহ করে দুর্বল ব্যাংকগুলোকে তারল্য সুবিধা দেওয়া হয়, যার মধ্যে ইসলামী ব্যাংক ছিল অন্যতম প্রাপক ।
৪.৩. নিয়োগ বাণিজ্য ও পেশাদারিত্বের পতন
এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণকালে শুধু আর্থিক দুর্নীতিই নয়, প্রশাসনিক কাঠামোতেও ব্যাপক অনিয়ম দেখা দেয়। ২০১৭ থেকে আগস্ট ২০২৪ সালের মধ্যে ব্যাংকটিতে প্রায় ৯,০০০ কর্মী নিয়োগ করা হয় কোনো প্রকার বিজ্ঞপ্তি বা প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা ছাড়াই ।
এই নিয়োগ বাণিজ্য ব্যাংকের পেশাদারিত্বের মেরুদণ্ড ভেঙে দেয়। অভিযোগ ওঠে, চাকরির আবেদন সংগ্রহ করা হতো এস আলম গ্রুপের চট্টগ্রাম অফিসের ড্রপবক্স এবং তাদের আবাসিক কার্যালয়ের মাধ্যমে । নিয়োগপ্রাপ্তদের অধিকাংশই ছিল চট্টগ্রাম, বিশেষ করে এস আলমের ব্যবসায়িক ঘাঁটি পটিয়া উপজেলা থেকে ।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, প্রায় ২,৫০০ কর্মচারী BGC Trust University, Port City International University, এবং Southern University -এর মতো স্থানীয় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমন সার্টিফিকেট জমা দিয়েছিল যা পরবর্তীতে "যাচাইযোগ্য নয়" বা ভুয়া বলে প্রমাণিত হয় । অনিয়মিত নিয়োগের উদ্দেশ্য ছিল ব্যাংকের ভেতরের প্রশাসনিক ও ঋণ বিতরণ প্রক্রিয়াকে একটি একক কর্পোরেট গোষ্ঠীর প্রতি অনুগত রাখা, যাতে নির্বিঘ্নে বিপুল পরিমাণ অর্থ বের করে নেওয়া যায় ।
অধ্যায় ৫: পুনর্গঠন ও শুদ্ধি অভিযান (২০২৪-২০২৫)
৫.১. রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও নতুন পর্ষদের আগমন
২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে সুশাসন ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া শুরু হয়। অন্তর্বর্তী সরকার এস আলমের নিয়ন্ত্রণে থাকা আটটি ব্যাংকসহ মোট এগারোটি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেয় ।
পুনর্গঠিত IBBL পরিচালনা পর্ষদ গ্রাহকদের আস্থা ও ব্যাংকের আর্থিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন গভর্নর আহসান এইচ মনসুরের নেতৃত্বে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ঘোষণা করে যে তারা সব আমানতকারীকে রক্ষা করবে এবং যারা অনিয়মের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাৎ করেছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে ।
৫.২. তহবিল আদায়ের উদ্যোগ ও এস আলম গ্রুপের শেয়ার বিক্রি
নতুন পর্ষদ ব্যাংক থেকে লুট হওয়া অর্থ আদায়ে দ্রুত পদক্ষেপ নেয়। ইসলামী ব্যাংকের বর্তমান চেয়ারম্যান ওবায়েদ উল্লাহ আল মাসুদ ঘোষণা করেন যে এস আলম গ্রুপের শেয়ার বিক্রি করে ১০ হাজার কোটি টাকা আদায়ের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
ব্যাংকটির বিনিয়োগ ও আমানতের মধ্যে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকার যে বিশাল ব্যবধান তৈরি হয়েছে, তা এস আলম গ্রুপের শেয়ার বিক্রি এবং নতুন শেয়ার ইস্যুর মাধ্যমে কমানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে । এই পদক্ষেপটি কেবল তহবিল পুনরুদ্ধারের জন্য জরুরি নয়; এটি নিয়ন্ত্রক সংস্থার পক্ষ থেকে একটি দৃঢ় বার্তা যে কর্পোরেট ক্যাপচারের মাধ্যমে অর্জিত নিয়ন্ত্রণ আর গ্রহণযোগ্য হবে না এবং ব্যাংকিং খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য এটি একটি নজির স্থাপন করতে পারে।
এছাড়াও, IBBL তার হারানো আন্তর্জাতিক খ্যাতি ও মূলধন পুনরুদ্ধার করতে পুরনো উদ্যোক্তা সৌদি প্রতিষ্ঠান আল-রাজি এবং ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স কর্পোরেশন (IFC)-কে পুনরায় যুক্ত করার প্রচেষ্টা শুরু করেছে।
৫.৩. দক্ষতা মূল্যায়ন এবং প্রশাসনিক শুদ্ধি (সেপ্টেম্বর ২০২৫)
ব্যাংকের প্রশাসনিক কাঠামোতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে এবং নিয়োগ বাণিজ্যের মাধ্যমে নিযুক্ত কর্মীদের যাচাই করতে নতুন পরিচালনা পর্ষদ একটি কঠোর পদক্ষেপ নেয়। তারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অফ বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (IBA)-এর মাধ্যমে একটি “special competency assessment test” (SCAT) আয়োজন করে।
পরীক্ষা ও বয়কট: প্রায় ৫,৩৮৫ জন অনিয়মিত নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫-এ পরীক্ষায় অংশ নিতে নির্দেশ দেওয়া হয় । কিন্তু ২৭ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত পরীক্ষায় মাত্র ৪১৪ জন অংশ নেন । বিপুল সংখ্যক কর্মীর পরীক্ষা বর্জন নির্দেশ করে যে তাদের নিয়োগ বাণিজ্যের অভিযোগের সত্যতা ছিল এবং তারা প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশে নিজেদের যোগ্যতা প্রমাণ করতে ইচ্ছুক ছিল না ।
OSD এবং বরখাস্ত: পরীক্ষা বয়কটের প্রতিক্রিয়ায় ব্যাংক কর্তৃপক্ষ দ্রুত প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেয়। প্রথমে ৪,৭৭১ জন কর্মকর্তাকে “Officer on Special Duty” (OSD) হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। OSD হিসেবে তারা বেতন ও ভাতা পেলেও কার্যত কোনো দায়িত্ব বা কর্তব্য বহন করবেন না । এটি প্রশাসনিকভাবে কর্মহীন করে প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে আনার একটি কৌশল। এরপর, সার্ভিস রুলস্ লঙ্ঘনের অভিযোগে প্রাথমিকভাবে ২০০ জনকে বরখাস্ত (terminated) করা হয় ।
এই কঠোর শুদ্ধি অভিযান প্রমাণ করে যে নতুন পর্ষদ দ্রুত প্রাতিষ্ঠানিক মেধা পুনরুদ্ধার এবং কর্পোরেট আনুগত্যভিত্তিক মানবসম্পদ অপসারণের মাধ্যমে ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ সুশাসন পুনরুদ্ধারে বদ্ধপরিকর।
অধ্যায় ৬: চ্যালেঞ্জ, সম্ভাবনা ও পুনরুদ্ধার কৌশল
৬.১. ইসলামী ব্যাংকের সামনে বর্তমান তারল্য, মূলধন ও আস্থার চ্যালেঞ্জ
ইসলামী ব্যাংক বর্তমানে তার ইতিহাসে সবচেয়ে গভীর সংকটের মুখোমুখি। প্রধান চ্যালেঞ্জগুলি হলো:
১. আস্থার সংকট: এস আলম কেলেঙ্কারি এবং নিয়োগ বিতর্কের ফলে সাধারণ গ্রাহকদের আমানতের নিরাপত্তা নিয়ে তীব্র উদ্বেগ তৈরি হয়েছে । ব্যাংকের আমানতকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনাটাই নতুন পর্ষদের প্রাথমিক কাজ।
২. তারল্য ও প্রভিশন ঘাটতি: প্রায় ৭০ হাজার কোটি টাকার প্রভিশন ঘাটতি মেটানো এবং এস আলম গ্রুপের বিপুল খেলাপি ঋণ (৫০,০০০ কোটি থেকে ৮০,০০০ কোটি টাকা) আদায় করা একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া, যা দ্রুত আর্থিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে বাধা সৃষ্টি করবে ।
৩. নিয়ন্ত্রক সীমা ও প্রবৃদ্ধি: বাংলাদেশ ব্যাংক ইসলামী ব্যাংকসহ এস আলমের নিয়ন্ত্রণাধীন অন্যান্য ব্যাংকের ওপর ঋণ বিতরণের ওপর কঠোর সীমা আরোপ করেছে। বর্তমানে পাঁচ কোটি টাকার বেশি ঋণ সুবিধা দেওয়ার জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পূর্বানুমোদন নিতে হয় । এটি ব্যাংকের স্বাভাবিক বাণিজ্যিক কার্যক্রম এবং প্রবৃদ্ধির গতিকে সীমিত করবে।
৬.২. জাতীয় অর্থনীতিতে IBBL-এর গুরুত্ব ও পুনরুদ্ধারের প্রভাব
এই সংকট সত্ত্বেও, বাংলাদেশে IBBL-এর গুরুত্ব অপরিসীম। এটি দেশের বেসরকারি খাতের বৃহত্তম ব্যাংক। বাংলাদেশে ইসলামী ব্যাংকিং খাতের প্রবৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে, যা সামগ্রিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ পরিচালনা করে (প্রায় ২৮ শতাংশ মার্কেট শেয়ার) । IBBL এই খাতের মূল চালিকাশক্তি।
অতীতে IBBL বৈধ চ্যানেলে রেমিট্যান্স আহরণে যে নেতৃত্ব দিয়েছিল, তা পুনরুদ্ধার করা গেলে জাতীয় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। একইভাবে, পোশাক এবং টেক্সটাইল খাতের অর্থায়ন পুনরুদ্ধার হলে দেশের শিল্পায়ন গতি ফিরে পাবে। তাই IBBL-এর পুনরুদ্ধার শুধুমাত্র একক প্রতিষ্ঠানের স্থিতিশীলতার প্রশ্ন নয়, বরং দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য এটি অত্যাবশ্যক।
৬.৩. পুনরুদ্ধার কৌশল এবং সুপারিশ
IBBL-এর পুনরুদ্ধার একটি বহুমাত্রিক কৌশল দাবি করে:
১. আইনি জবাবদিহিতা: অনিয়মের মাধ্যমে যারা ব্যাংক থেকে টাকা নিয়েছে, বিশেষত এস আলম গ্রুপ ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান, তাদের শাস্তির জন্য আদালতে মামলা দায়ের করা এবং তাদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা প্রয়োজন ।
২. মূলধন পুনর্গঠন ও আন্তর্জাতিকীকরণ: এস আলম গ্রুপের শেয়ার বিক্রির মাধ্যমে মূলধন ঘাটতি কমানো এবং নতুন শেয়ার ইস্যু করা । পাশাপাশি, পুরোনো আন্তর্জাতিক অংশীদার যেমন আল-রাজি এবং আইডিবিকে তাদের হারানো বিশ্বাস ফিরিয়ে এনে পুনরায় ব্যাংকের সাথে যুক্ত করার উদ্যোগ অব্যাহত রাখা অপরিহার্য ।